একেশ্বরবাদ ও নাস্তিক্যবাদ এর সামাজিক চাহিদা।


আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা নিজেদের বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসীদের দলের অন্তর্ভুক্ত করি। দু'টোরই প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। বিশ্বে প্রচুর ধর্ম ও ত্বত্ত্ব আছে যেগুলোর উপর ভিত্তি করেই বিশ্বাস ও অবিশ্বাস আসে। আমরা মানুষরা প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দলভুক্ত হয়ে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করি। আচ্ছা আপনাদের সময় নষ্ট না করে আজকের মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। এ'দুটি দর্শন যুক্তি ও বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তি ও বিশ্বাস একে অপরের বিপরীতধর্মী। যেখানে বাক্যের সত্যতা প্রমাণের জন্যে বচন প্রয়োগ হচ্ছে যুক্তি এবং উলটো দিকে বাক্যের সত্যতা কোনো তথ্য ছাড়াই মেনে নেওয়া হলো বিশ্বাস। 

একেশ্বরবাদ ও নাস্তিক্যবাদের চাহিদা আমরা তিনটি ভাগে করবো,

১. দু'টি দর্শনের সংজ্ঞায়িত বর্ণনা,

২. স্থান ও কাল ভেদে দর্শন,

৩. আধুনিক সমাজে এ দু'টি দর্শনের গ্রহণযোগ্যতা।

একেশ্বরবাদ ও নাস্তিক্যবাদ-কে আমরা গুলিয়ে ফেলি তাই আজকের এ আর্টিকেলে আমি এ দুটির পার্থক্য, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলবো। তাহলেই প্রথমে আসি একেশ্বরবাদ নিয়ে।


১.একেশ্বরবাদের সংজ্ঞায়িত বর্ণনা:


যে ত্বত্ত্ব কিংবা দর্শন বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি প্রদর্শিত করে এক ঈশ্বরের আরাধনা করার অঙ্গিকার নেয় তবে প্রথাগত কোনো ধর্মের সাথে যোগসূত্র রাখে না তাই একেশ্বরবাদ। সহজ কথায় সকল ধর্মের ও আধ্যাত্মিক ত্বত্তের প্রতি সম্মান রেখে বর্জন করার নামই একেশ্বরবাদ। একেশ্বরবাদ, মানবতাবাদ ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়বস্তু অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।

একেশ্বরবাদ বলে, ধর্ম মানুষের প্রয়োজনে তৈরি হলেও এখনার সমাজে ধর্ম ব্যবসায়ী মহল একে মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিতে ব্যবহার করছে, ধর্মকে ব্যবহার করেই কয়েক যুগ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। মানুষ আবেগপ্রবণ প্রাণী, মানুষ এখন আদিম কালেই রয়ে গিয়েছে, আমরা বিশ্বাস করতে চাই অলৌকিকতাতে। কোনো ঘটনার প্রমাণ না পেলে আমরা তাকে ঈশ্বর কিংবা অলৌকিক সত্ত্বার কর্ম বলি। আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে চন্দ্র/সূর্য না দেখে দেখি দেব-দেবীর প্রতিমা। 

ধর্ম তৈরির পিছনে প্রথমেই আসে পুঁজিবাদ, প্রথমে পুঁজিবাদের চিন্তা এতটা প্রখর না হলেও কালক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষকে গড়ে তুলছে অন্ধ করে। ধর্মের মাঝে ভালো কোনো কথা বা তথ্য নেই বলা ভুল হবে কারণ সকল কিছু খারাপ হলে মানুষ য়া ধরে ফেলবে তাই ভালো-খারাপ কে মিলিয়েই ধর্মের সৃষ্টি। বিষয়টি এমন হয়েছে যে হাজার খানেক সত্যের মাঝে এক ছটাক মিথ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া এবং অবশ্যই তা বুদ্ধিমানের কাজ। ধর্ম ব্যবসায়ী-রা বুদ্ধিমান না হলে এতদিন মানুষের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে দেশের পর দেশ দখল করতে পারতো না; পারতো ভীনদেশী কেউ নিজের বংশের আলো ছড়িয়ে দিতে।

মানুষকে অজ্ঞ কিংবা মূর্খ করার হাতিয়ার হলো ধর্ম। তাই একেশ্বরবাদ ধর্মের ভালো দিকগুলো সমর্থন করে কিন্তু গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের সংস্কার চায় না। 

একেশ্বরবাদী-দের মতে, ঈশ্বর হলেন এমন এক সত্ত্বা যে সত্ত্বার সান্নিধ্য পাওয়া দুষ্কর হলেও অসম্ভব না। কঠিন ও সঠিক আরাধনার মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া যায় তবে এই সাধনা চলমান থাকতে পারে কয়েকযুগও! ঈশ্বর এমন নয় যে নিজের সৃষ্টির মাঝে ভাগ করে যুদ্ধের জন্যে লেলিয়ে দেবেন, তিনি নিজের সৃষ্টির ধ্বংস তারই সৃষ্টির মাধ্যমে নিশ্চই হতে দেবেন না। পৃথিবীর কলহ, বিভেদ, দুখী ও অসহায়দের সংখ্যা অনেক হবার একমাত্র কারণ তারা ঈশ্বরের সাধনার সঠিক উপায় জানে না। সাধনা কখনোই কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে সমর্থন করে না কিন্তু আমরা মানুষ এ সাধনাকে ধর্মের মাঝে এনে গড়মিল করেছি।


২. স্থান ও কাল ভেদে একেশ্বরবাদ: 


মানুষের বসবাস ও সেই সময়কার মানসিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এই ত্বত্তের মানুষের বৃদ্ধির জন্যে বিরাট ভূমিকা রাখে। যদি আপনার চারপাশে অধিকাংশ মানুষ আস্তিক হয়, বিজ্ঞানকে অপবিত্র ভেবে থাকে, অনৈতিকতায় ভরপুর থাকে, ভালো মানুষ চোখের সামনে অপদস্ত হতে দেখেন তবে আপনার একেশ্বরবাদী হওয়ার সম্ভাবনা ৪০ কিংবা ৪৫ শতাংশ। কেননা ধর্মান্ধ আস্তিক আপনার মস্তিষ্কের বিকাশ হতে বাঁধা দিবে, তাই আপনি যতই গণ্ডি থেকে বের হতে চান আপনি আংশিক-ই বের হতে পারবেন। দেখা যাবে এ আংশিকতা অদূর ভবিষ্যতে আপনাকে ধর্ম বিদ্বেষী কিংবা নাস্তিকতার দিকে ধাবিত করবে। 

কিন্তু যদি আপনার পরিবার, সমাজ বিজ্ঞানমনস্ক হয়, আপনি কোনোভাবে যদি শিল্পের দিকে ঝুঁকে যান, ধর্ম বিষয়ে আপনাকে চাপ কম দেওয়া হয় তবে আপনার ৭৫ থেকে ৯০ ভাগ সম্ভাবনা আছে একেশ্বরবাদী হওয়ার।

কারণ আপনি গ্রহণ করা শিখবেন, বিজ্ঞান কিংবা শিল্প আপনাকে সঠিক পথ-ই দেখাবে, আপনার মানসিকতা বৃদ্ধি করবে এবং আপনি ভালো-মন্দ নিজ হতে যাচাইয়ে পারদর্শী হবেন।

দু'টি দর্শনের সমাজে গ্রহণযোগ্যতা একই সাথে শেষের দিকে জানাবো, এখন চলুন নাস্তিক্যবাদ নিয়ে কিছুটা জেনে আসা যাক।


১. নাস্তিক্যবাদের সংজ্ঞায়িত বর্ণনা: 


যে ত্বত্ত্ব কিংবা দর্শন বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি প্রদর্শনে নিরীশ্বরের প্রমাণ দেয় তাই নাস্তিক্যবাদ। সহজ কথায় কোনো কিছুর উপরই বিশ্বাস না করাই নাস্তিকবাদ। ঈশ্বর না বলে 'কোনো কিছু' উল্লেখ করেছি কারণ নাস্তিকদের মাঝেও ভাগ দেখা যায়। অর্থাৎ এক ভাগ ঈশ্বর সহ অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে না আরেক ভাগ একদম কিছুতেই বিশ্বাস করে এবং এই ভাগের চিন্তা গুলোয় কিছুটা গড়মিল আছে। তারা বস্তুবাদীও না। কেমন যেন সবকিছুতেই তাদের হেলাফেলা। একেশ্বরবাদী-দের মত তারাও প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাস করে না এবং তারা এ-ও বলে যে পৃথিবীতে ধর্মের কোনো প্রয়োজনই নেই। এইদিক দিয়ে একেশ্বরবাদীর সাথে তাদের দ্বন্দ্ব। নাস্তিক্যবাদ এমন এক দর্শন যা আসলে খণ্ডন করে ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ না। একেশ্বরবাদীতা অন্তত বোঝা গেলেও নাস্তিক্যবাদ বোঝা কঠিন।


২. স্থান ও কাল ভেদে নাস্তিক্যবাদ:


মানুষের বসবাস ও সেই সময়কার মানসিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এই ত্বত্তের মানুষের বৃদ্ধির জন্যে বিরাট ভূমিকা রাখে। যদি আপনার চারপাশে অধিকাংশ মানুষ আস্তিক হয়, বিজ্ঞানকে অপবিত্র ভেবে থাকে, অনৈতিকতায় ভরপুর থাকে, ভালো মানুষ চোখের সামনে অপদস্ত হতে দেখেন তবে আপনার একেশ্বরবাদী হওয়ার সম্ভাবনা ৪০ কিংবা ৪৫ শতাংশ। কেননা ধর্মান্ধ আস্তিক আপনার মস্তিষ্কের বিকাশ হতে বাঁধা দিবে, তাই আপনি যতই গণ্ডি থেকে বের হতে চান আপনি আংশিক-ই বের হতে পারবেন। দেখা যাবে এ আংশিকতা অদূর ভবিষ্যতে আপনাকে ধর্ম বিদ্বেষী কিংবা নাস্তিকতার দিকে ধাবিত করবে। 

কিন্তু যদি আপনার পরিবার, সমাজ বিজ্ঞানমনস্ক হয়, আপনি কোনোভাবে যদি শিল্পের দিকে ঝুঁকে যান, ধর্ম বিষয়ে আপনাকে চাপ কম দেওয়া হয় তবে আপনার ৭৫ থেকে ৯০ ভাগ সম্ভাবনা আছে একেশ্বরবাদী হওয়ার।

কারণ আপনি গ্রহণ করা শিখবেন, বিজ্ঞান কিংবা শিল্প আপনাকে সঠিক পথ-ই দেখাবে, আপনার মানসিকতা বৃদ্ধি করবে এবং আপনি ভালো-মন্দ নিজ হতে যাচাইয়ে পারদর্শী হবেন।

স্থান ও কাল ভেদে নাস্তিক কিংবা একেশ্বরবাদী দু'ই হওয়া যায় এবং তা শুধুই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। 

এখন আসা যাক শেষ কথায়, এই দু'য়ের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা।


৩. একেশ্বরবাদ ও নাস্তিক্যবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা:


পৃথিবী সুন্দর, জীবন শুধুই একবার-ই পাওয়া যায়। আত্মার যেহেতু মৃত্যু কিংবা ধ্বংস নেই তাই আমাদের হয়তো আবারও ফিরে আসতে হবে তবে সে ফিরে আসা হবে অন্য কোনো রূপে। হয়তো অন্য কোনো শরীরে, আমরা আমাদের পাপ-পূণ্যের হিসেব অনুযায়ী নরক ও স্বর্গে কিছুকাল যাবত অবস্থান করে আবারও ফিরে আসবো, আর এই ব্যবস্থা চলতে থাকবে। এই ফিরে আসাতেও আনন্দ নেই কারণ মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হলে আমাদের পূর্বের ইতিহাস কিছুই মনে থাকবে না, আমরা ভুলে যাবো আমরা এর আগে কী ছিলাম। এক নতুন করে আমাদের গড়ে উঠতে হবে।


বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন, যদি সারাজীবন কেউ স্বর্গে থাকে, 'সারাজীবন' হলো এক অস্বস্তিকর দীর্ঘ জীবন যার অন্ত নেই, এমন জীবনে অবশ্ই একঘেয়েমি আসবেই। অথবা যদি বলি কেউ সারাজীবন নরকে থাকবে, তাহলে তার জন্যেও কিন্তু এ একঘেয়েমি। অনবরত শাস্তি বা শান্তি পেতেই থাকলে তখন আর শাস্তি বা শান্তি পাওয়া হয় না, আর চিন্তা করে দেখুন আমরা কখনোই বুড়োই হবো না! আজীবন একই বয়সে থেকে যাবো!

এ তো একদম সহজ কথা, সুখ ও দুঃখ মিলিয়েই জীবন, জীবনে একই সাথে সুখ ও দুঃখ থাকায় জীবন বৈচিত্রময়, সুন্দর। জীবন শুধুমাত্র একবার পাই এক মানুষ হয়ে, আর তাই আমাদের জীবনের প্রতি মায়া থাকে। 

একেশ্বরবাদ বলেন বা নাস্তিক্যবাদ-ই বলেন এই দুই দর্শন-ই মানুষকে সত্যের দিকে পরিচালিত করে। গোঁড়া ধার্মিকতা কখনোই সুফল বয়ে আনেনি(এনে থাকলেও তা স্থায়ী না) মানুষের মাঝে যেসকল দ্বন্দ্ব, জাতপাতের বৈষম্য তা কিন্তু এ দু দর্শনে নেই, এ দু'টো আমাদের মুক্তির পথ দেখায়, আমাদের-কে বাঁধ ছাড়া করে, আমাদের-কে সৃজনশীল হতে অনুপ্রেরণা দেয়। এ বিশ্বে অবশ্যই দর্শন দুটির প্রয়োজনীয়তা আছে।

গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে তবে এর হার কম। কেননা আমরা সত্যান্বেষী না, আমরা সত্যকে ভয় পাই। ধার্মিক-রা সবসময়ই স্বার্থের পাগল, তারা স্বার্থ হাসিলের জন্যেই মানুষের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে থাকে আর আমরা মানুষ-রাও সে ফাঁদে পা দিই জেনে অথাব না জেনেই।

ছোট বয়স থেকেই সৃজনশীল না করে আমাদের চিন্তাশক্তিতে দমিয়ে দেওয়া হয়, অহেতুক ভয় পেয়ে বসে আমাদের। আমরা চিন্তা করতেই ভুলে যাই সারাজীবন এক বয়সে থেকে শাস্তি কিংবা শান্তি পাওয়া বিরক্তিকর ও অসম্ভব। 

আশা করি আমি আমার কথা গুলো তুলে ধরতে পেরেছি, আমি চেষ্টা করেছি দর্শন দু'টিকে স্পষ্ট করার যদি এত ভালো করে এর স্পষ্টতা আসেনি লেখায়। তবে প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দেওয়ার চেষ্টা করবো।

" ভালো থাকবেন সবাই, মহামারীতে যেন আমাদের সকলের পরিবার ও প্রিয়জন সুস্থ থাকে এবং সচেতন থাকে। দরকার ব্যতীত ঘর থেকে বের হবেন না, বের হলেও নিজেকে স্যানিটাইজ করবেন ও মাস্ক ব্যবহার করবেন। "

সকলের সুস্থতা কামনা করছি।

ধন্যবাদ।



লেখায়: মুনতাসির নাহিয়ান

মুক্তচিন্তক, সাম্যবাদী, সমাজতন্ত্রী।

Comments