কবিতা শেখার সহজ উপায় দেখে নিন




 আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ছন্দের সাথে বেশ পরিচিত । গান, নাচ, নাটক আমাদের শিল্প সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। আজ আমি কথা বলবো সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা কবিতা নিয়ে। আমরা সবাই কবিতা শব্দের সাথে পরিচিত, কবিতা শব্দটি শুনে আমাদের সামনে ভেসে আসে ছন্দ ভিত্তিক পঙক্তিতে সাজানো শব্দমালা যা আমাদের পড়ে মনে শান্তি আসে, তৃপ্তি মেলে। জ্বী আজ এ ব্লগে আমি সর্বোচ্চ তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করবো। এ ব্লগে কী কী থাকছে তা আগে জেনে নেওয়া যাক।

এ ব্লগে যা যা থাকছে;

১। কবিতা কাকে বলে?

২। কবিতার প্রকারভেদ ও শ্রেণীবিন্যাস বর্ণনা।

৩। কবিতার ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা।

৪। তরুণ কবিদের জন্যে কিছু সহজ রীতিনীতি।

কবিতা কাকে বলে 

কবিতা প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের মাঝে আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কবি কবিতার সঠিক সংজ্ঞা দিতে পারেননি, মূলত এর সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবও নয়। এর গভীরতা ও বিশালতা ব্যখ্যা প্রকৃত কবি ব্যতীত কেউ দিতে পারবেন না। চলুন আজ আপনাদের এর সংজ্ঞা আমি বলি। এক কথায় বললে কবিতা হলো কিছু ছন্দের অন্তমিল রেখে সুন্দর ও সাবলীল শব্দের প্রয়োগ। এবার আপনারা বলবেন, বাহ সংজ্ঞা তো অনেক সহজ। আসলে বিষয়টি কিন্তু এত সহজ না। আমার দেওয়া সংজ্ঞায় আপনারা শুধুমাত্র দশ ভাগ জেনেছেন কবিতার। 

জ্বী সত্য বলছি, মজা করছি না। ধরুন আজ আপনার বাজার করার কথা। আপনি সবুজ ব্যাগ নিয়ে সোজা রাস্তায় বাজারে যাচ্ছেন। বাজারে গিয়ে আপনি প্রথমে সবজি কিনতে গেলেন। এরপর লাউ, কোমড়ো ও পটল কিনলেন। এবার এলেন মাংস কিনতে। আপনি কিনলেন মুরগী। এরপর এলেন শুকনো বাজারের দোকানে। চাল, আলু, পেয়াজ  আর মশলা প্রয়োজন আপনার। এছাড়াও প্রয়োজন দুধ ও চিনি
এবার বলছি কেন আপনাদের বাজারের উদাহরণ দিয়েছি। আপনার বাজার করার ভাবনা হলো কবিতার ক্ষেত্রে ধরলে কবি সত্তার আত্মপ্রকাশ। ঐ যে সবুজ ব্যাগ, তা হলো স্বচ্ছ মনের  কবিতা পুঞ্জি অথবা বলতে পারেন কবিতার প্রতি কবির ভালোবাসা যা হৃদয়ের গভীরে পুঞ্জীভুত থাকে। 

এবার ভাবুন তো কবিতার ক্ষেত্রে সবজির অর্থ কী? সবজি হলো প্রকৃতি। যে প্রকৃতি ব্যতীত কোনো কবি, কবি হতে পারতো না। প্রকৃতির মূল কাজ হলো কবির চেতনা বৃদ্ধি করা, সমৃদ্ধ করা। আপনারা নিশ্চিত ভাবছেন কোন পাগলের পাল্লায় পড়লেন! শেষ পর্যন্ত থাকুন বুঝতে পারবেন। আসুন বাকি বাজার ফর্দের অর্থ বলি।


মাংস হলো আমিষ, এ কথা আপনারা জানেন এবং অবশ্যই ভাবছেন কবিতার মাঝে আমিষ কোথা থেকে আসবে? আমাদের দেহ হলো আমিষ। দেহের সাথে কবিতার সম্পর্ক আছে। শিল্প দাঁড়িয়েছে আছে বা মূল ভিত্তি হলো দেহ। দেহের চেয়ে বড় কোনো শিল্প নেই। একই কথা কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ শরীর আমাদের সাধনা শেখায়। শরীর বুঝায় বেঁচে থাকার তাগিদ, আমাদের দেখায় দেহের শক্তি, ক্ষমতা, শৈলী, ছন্দ, আদিমতা। 

আদিমতা ছাড়া শিল্প হয় না, হয় না কোনো সাহিত্য। শেষের সে শুকনো বাজারের প্রতি উপাদান হলো কবিতার উপাদান এবং একই সাআথে কবিতার ধরণ। আলু হলো কবিতার স্থায়িত্ব বা শক্ত শব্দের সমন্বয় । পেয়াজ হলো রূপক, পেয়াজের বাইরে যেমন কঠোর ভেতরতের নরম আবার বাইরে যেমন ঝাঝ ছাড়া ভেতরে তেমনি ঝাঁঝাআলো। অর্থাৎ কবিতার নামের সাথে ভেতরে কিছু মিল্বে না এবং সেই একই কবিতাই দুই অর্থ বহন করবে। 


মশলা  হলো কবিতার খুঁটিনাটি। মশলার পদ অনুযায়ী কবিতার পদ যেমন; পর্ব, মাত্রা, পঙক্তি। মনে রাখবেন সুর, তাল ও ছন্দ মশলার মধ্যে বিবেচনা করবেন না। সেগুলো দেখানোর জন্যে এখনো বাজারের ফর্দ আছে। দুধ, চিনি, চা-পাতার কথা তো ভুলে গেলে হবে না। জ্বী এগুলোই কবিতার ছন্দ, সুর, তাল তবে শুধুমাত্র এ কথাটি চিনির ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া যায়। দুধকে বলা হয় লুকোনো সত্য। দুধ প্রথমত দেখে বুঝা যায় না আসলে তা কি দুধ না অন্য কোনো গুড়ো। ঘোলাটে কবিতার জন্যে এ দুধ উপকরণ। 


দুয়েকজন কবির কবিতা নিয়ে দেওয়া সংজ্ঞা দেখা যাক।

বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক কবি ও দার্শনিক এরিস্টটল-কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়ো।

উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কবি পার্সি বিশি শেলি - কবিতা পরিতৃপ্তির বিষয়। কবিতা তখনই স্বার্থক হয়, যখন কবি মনের পরিতৃপ্তিতে পূর্ণতা আসে।


ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম রোমান্টিক কবি জন কীটস - কবিতা মুগ্ধ করবে তার অপরিমেয়তায়, একটি মাত্র ঝংকারে নয়। পাঠকের মনে হবে এ যেন তারই সর্বোত্তম চিন্তা যা ক্রমশ ভেসে উঠছে তার স্মৃতিতে।


কবি রবার্ট ফ্রস্ট - কবিতা হলো পারফরমেনস ইন ওয়ার্ডস।


কবি কোলরিজ - গদ্য মানে শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো। আর পদ্য মানে সর্বোৎকৃষ্ট শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো।

কবিতা নিয়ে দুইজন বিখ্যাত কবির বিখ্যাত সংজ্ঞা,

কবি সেন্ট অগাস্টিনের মতে - যদি জিজ্ঞেস করা না হয়, আমি জানি। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সেটা আমি জানি না। অর্থাৎ কবিতার অর্থ জানা থাকলেও বলতে হলে বলা যায় না!

আর কবি জনসনের ভাষায় - কবিতা হলো মেট্রিক্যাল কম্পোজিশন, আনন্দ ও সত্যকে এক করার শিল্প। সোজা কথায় কোনো বিষয়কে উপস্থাপন করতে কল্পনা ব্যবুহার করা। কবিতা এমন এক শিল্প যে শিল্পে সত্য বলা হয় কল্পনার মাধ্যমে।

যে ক'টি সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এর মাঝে একটিও সম্পূর্ণ সঠিক নয় এবং হওয়া সম্ভবও নয়। প্রতিজন কবি অথবা দার্শনিক শুধুমাত্র কবিতা প্রসংঙ্গে তাদের ভাবনা জানিয়েছেন। তাহলে কবিতার আসল অর্থ কী? এখানে শুরু থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো সংজ্ঞা দেয়া আছে সবগুলোর একক ফল কবিতা। আশা করি বুঝেছেন।

কবি হুমায়ুন আজাদের মতে, যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃৎপিন্ডে রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না, যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও, রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম কবিতা।


কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, কবিতা বোঝার বিষয় নয়, এটাকে অনুভব করতে হয়।  কারণ কবি সম্ভবত বুঝেসুঝে কবিতা লেখেন না, কেবল মাত্র বিষয়কে সামনে রেখে তাকে অনুভব করেই কবিতার জন্ম হয়।” কবিতা নিয়ে তিনি খুব সহজ একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। এখানে তিনি কবিতাকে খুব সহজ করে উপস্থাপন করেছেন। উনার সংজ্ঞায় বুঝা যায়, কবিতা জটিল কিছু নয়। মানুষের মনের আবেগ ও অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশ হলো কবিতা।


কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বলেছেন, যে লেখাটি সমকালের স্মৃতি বা স্বপ্নকে তুলে আনতে সক্ষম এবং একই সাথে সমকালকে অতিক্রমের যোগ্যতা রাখে, তাকেই বোধহয় কবিতা বলা যেতে পারে।” তিনি কিছুটা সংশয় নিয়ে কবিতার সংজ্ঞাটি দিয়েছেন। তবে উনার দেওয়া সংজ্ঞা বেশ স্বতন্ত্র ও অর্থবহ। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, কবিতা সমকালকে তুলে ধরতে সক্ষম এবং ভবিষ্যতের ভাবনায় বিচরণ করতে পারে।

এখানে শুধুমাত্র  কয়েকজন কবির ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে যেগুলো বুঝতে সুবিধী হবে আপনাদের।


কবিতার প্রকারভেদ ও শ্রেণীবিন্যাস বর্ণনা

কবিতার সংজ্ঞা জানার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর প্রকার, ধরণ, শ্রেণী সম্পর্কে জানা। কেন তা জানা প্রয়োজন? কারণ আপনি যদি মাছ খেতে চান,কিন্তু আপনি মাছ চিনেন না তাহলে কিনবেন কী করে? যদি আপনি না জেনে থাকেন কোন মাছ কেমন স্বাদের? কোন মাছ পুকুরের, কোনটি নদীর্, কোনটি সাগরের; এ তথ্যগুলো আপনার জানা থাকলে আপনি আপনার পছন্দমত মাছ কিনে খেতে পারবেন।

কবিতার জন্যেও এ একই কথা। যদি না জানেন কোন ধরণের কবিতা আপনি/পাঠক পছন্দ করে, সেগুলো কেমন, কীভাবে লিখবেন তবে কি আপনার দ্বারা কবিতা লেখা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব না, তাই আপনার উচিত কবিতার সবকিছু সম্পর্কে বিশদ ধারণা রাখা। তাহলে আসুন এবার এর প্রকারগুলো জেনে নেওয়া যাক। তবে একটি কথা আমি আপনাকে অবশ্যই বলবো, প্রকার, শ্রেণী এই দুইটি কথা মোটেও এক নয়। আপনি যদি না জেনে থাকেন তাহলে আজ জেনে নিন।

কবিতার প্রকার বলতে বুঝায় কত রকমের কবিতা লেখা যায়। কবিতার শ্রেণী বলতে বুঝায় কত ভাবে লেখা যায় । আসুন দেখাচ্ছি।

কবিতার প্রকার

কবিতা প্রধানত দুই প্রকার - 

১।  গীতি কবিতা

২। বর্ণনামূলক কবিতা বা কাব্য

গীতি কবিতা সাধারণত ৮ প্রকার তবে অনেকের মতে এর সংখ্যা দশ আবার অনেকের কাছে তা পনেরো।

১। রুবাইয়াৎ

২। সিজো

৩। ক্বসিদা

৪। চতুর্দশপদী

৫।  গজল

৬। অণুকবিতা

৭। লিমেরিক বা পঞ্চশৈলী

৮। হাইকু


বর্ণনামূলক কবিতা বা এরিস্টটলের মতে পোক্ত কবিতা প্রধানত দুই প্রকার, যেমন - 

১।  শ্রেণী বা ধারা কবিতা

২। বিষয়ভিত্তিক কবিতা


শ্রেণী  বা ধারা কবিতা মোট  ৭টি

১। মহাকাব্য

২। নাট্যকাব্য 

৩। বিদ্রূপাত্মক 

৪। গীতিকাব্য

৫। শোককাব্য

৬। পদ্য আখ্যান

৭। গদ্য আখ্যান।

আমি এখানে সবগুলোর ব্যাখ্যা দেব না, আমি চেষ্টা করবো প্রতি ভাগকে একটি একটি করে আর্টিকেল তৈরি করতে। কিন্তু এখনো আপনাদের একটি মজার কথা বলা হয়নি। আপনারা কিছুটা উপরে গেলে প্রকার পাবেন এবং যেখানে দুই প্রকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিংশ শতাব্দিতে এসে এই দুই প্রকার হয়েছে তিন প্রকার। শ্রেণী ভাগ থেকে গদ্য আখ্যান বা গদ্য কবিতা বা আধুনিক গদ্য কবিতা নামে একটি শাখা করা হয়েছে ২০১৮ এর শেষের দিকে, শাখার নাম রাখা হয়েছিল আধুনিক কবিতা। এ শাখার কবিতা নিয়ে একটু পরেই বলছি।


বিষয়ভিত্তিক কবিতা

এ শাখার কবিতা গুলো এক কথায় এক একটি বিষয়ের উপর লেখা হয়। যেমন ধরুন দেশের জন্যে কবিতা লিখবেন তাহলে দেশত্ববোধক কবিতা, জাগরণের জন্যে জাগরণের কবিতা, প্রেমের জন্য প্রেমের কবিতা। অর্থাৎ যেকোনো বিষয়ের উপর লেখা কবিতাই হলো বিষয়ভিত্তিক কবিতা।


আধুনিক কবিতা

আধুনিক কবিতার শাখাটি এখনকার সময়ে অধিক জনপ্রিয় কবিতার শাখা। কেননা এ শাখাটি অন্যান্য গুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক কবিতা হলো স্বাধীন কবিতা, এখানে নেই কোনো নিয়ম বা বাঁধাধরা, ছন্দ মেনে পর্ব/মাত্রা/তাল ঠিক রাখার প্রয়োজন পড়ে না এখানে। এই শাখাটি মনে করিয়ে দেয় এরিস্টটল ও জনসনের কথা। কবিতা হওয়া উচিত কল্পনায় তৈরি সত্যের চেয়ে শক্তিশালী। যেন একটি কল্পন্নায় তৈরি কবিতা দৃঢ় হয়, স্বাধীন ও মুক্ত হয় পাখির মত। আধুনিক কবিতা আমাদের তেমন হওয়ার সুযোগ দেয়। 

আধুনিক কবিতার মধ্যে তিনটি অংশ থাকে, অংশগুলো হলো-

১। সূচনা ( এ অংশে সাধারণভাবে বিষয়টির উপর নজর দিতে হবে, সুন্দর রাখতে  হবে )

২। বর্ণনা ( এ অংশে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং একই সাথে ঘোলাটে করতে হবে পাঠকের জন্য ) 

৩। সমাপ্তি ( এ অংশহটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অংশ দিয়েই যাচাই করা হবে আদো কি এ কবিতা; কবিতা হয়েছে কি? এ অংশটিতে প্রথমে রূপকের ঝড় তুলতে হবে, কবিতা মোড় নিয়েই কবিতাকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে হবে, এরপর শেষ করতে হবে। )

***মনে রাখবেন, আধুনিক কবিতা লেখার সময় একটি মুল ও একটি সাহায্যকারী বিষয় নির্বাচন করুন এবং চেষ্টা করুন দুটি বিষয় যেন দুই ধরণের হয়।


কবিতার বিস্তারিত ইতিহাস

এখন আপনারা এসেছেন আসল তথ্য পেতে, এখন আপনাদেরকে কবিতারা ইতিহাস বলবো, তবে তার আগে বলে দিচ্ছি, অধৈর্য হলে এ আর্টিকেল আপনার জন্যে নয়। কবিতার চর্চা শুরু হয় মানুষের অক্ষরজ্ঞান হওয়ার আগে, যখন মানুষ কথাও বলতে পারতো না।  শব্দ জ্ঞান থাকা অবস্থায় আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিচিত্র শব্দ করে বাকিদের সংকেত দিতাম। একেক শব্দ দিয়ে একেকটি বিষয় বুঝতাম।

আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধির তুলনায় আমাদের বুদ্ধি কিছুই না। জ্বী, সত্য বলছি। আমরা এ সময়ের সবচেয়ে আধুনিক হয়েও। তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসেও আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছাকাছিও  আসতে পারিনি। আমাদের অবজেক্টিভ নলেজ অধিক হলেও সাবজেক্টিভ নলেজ একদম নেই বললেই চলে। তাদের বেঁচে থাকার মূল উপাদান ছিল প্রকৃতি।

আচ্ছা যা হোক, আসল কথায় ফিরে আসি। তাহলে আমরা জানি আগেকার মানুষজন কবিতায়া আগ্রহী ছিল। তারা ছন্দ শিখতো আশপাশের প্রকৃতি থেকে, সুর তুলতো বৃক্ষের ছায়ায় ঘোর অরণ্যে। ইতিহাসবিদদের মতে, মহাভারত পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো মহাকাব্য। গত দুই যুগ ধরে আমরাই তাই মেনে এসেছি। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে এসে আমাদের থেমে থাকতে হচ্ছে না কিছুর জন্য, আমরা জানতে পারছি, গবেষণা করে জ্ঞানের আরো গভীরে যেতে পারছি।

তবে অবাক করার তথ্য হচ্ছে এ মহাভরতের অনেক আগে এসেছে গিলগিমেস বা গিলগামেশ  মহাতকাব্য। যার রচনাকাল ( ২১০০ - ২২০০ ) খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ যা আজ থেকে প্রায় ৪০০০ চার হাজার বছর আগে এবং মহাভারত  এসেছে ( ১২০০ - ১৩০০ ) খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ যা আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বচ্ছর আগে।

তাহলে সবচেয়ে প্রাচীন মহাকাব্য হলো গিলগিমেস । এখন অবশ্যই বুঝতে পারছেন সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ ছিল সে কালে। মহাকাব্য গুল মূলত শুধু মাত্র কবিতা নয়, এগুলো সভ্যতা, সংস্কৃতি, লোকসমাজ ও ধর্মের ধারক। কবিতার ইতিহাস এ চার হাজার বছরের চেয়েও পুরোনো, ধারণা করা হয় মানুষের অক্ষর জ্ঞান হওয়ার পূর্বে মানুষের ভাষা ও শব্দ জ্ঞান হয়েছিল। শব্দ জ্ঞানে থাকা অবস্থায় বা আজ থেকে প্রায় নব্বই কিংবা লক্ষ বছর পূর্বে শব্দ জ্ঞগানের বা শব্দ ব্যবহার করতে শিখেছিল মানুষ। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এ সময়কাল হলো সত্তর হাজার বছর আগে।

 শব্দ জ্ঞান তাদের অনেক সুবিধা দিয়েছিল। যদি আপনি মানুষের ইতিহাস না জেনে থাকেন তবে কথাগুলো আপনার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী মধ্যে এক মাত্র আমরা হোমো সাপিয়েন্সরাই আমাদের বাকি তিন প্রজাতিকে মেরে টিকে আছি। অন্য প্রজাতি অস্ত্র ও কৃষিতে এগিয়ে থাকলেও আমরাই এক মাত্র শব্দ ব্যবহারে পারদর্শী ছিলাম এবং এই জ্ঞান আমাদের অন্য প্রজাতির ধ্বংস ডেকে এনেছে। 

কবিতা এক্মমাত্র প্রাচীন সাহিত্য যা আজও টিকে আছে। কবিতা নিয়ে জানার বা বুঝার আগ্রহ থাকলে তাকে গ্রিক ও রোমান মিথলজি পড়তে হবে এবং একই সাথে গ্রিক সাহিত্য। পৃথিবীর সর্বৎকৃষ্ট সাহিত্য গ্রিক সাহিত্যকেই বলা হয়। তাই অবশ্যই এগুলো পড়বেন।  

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম কয়েকজন কবিদের কবিতা বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করবো, তবে এখন ভাবছি এমনিতেও অনেক বড় হয়ে গিয়েছি। তাছাড়া ব্যাখ্যা করা এ ব্লগের মূল বিষয় না। এ ব্লগ লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য পাঠক যেন কবিতা বুঝতে পারে এবং এক সময় যখন সে লেখা শুরু করবে তখন যেন তার কাজ আসে এ ব্লগ। কথা অনেক হয়েছে, এবার শেষের দিকে আসা যাক। এবার আপনাদের জানাবো কিছু বিষয় যা একজন কবির জানা দরকার ও কবিতা লেখার সময় যা কাজে লাগানো যাবে।


তরুণ কবিদের জন্যে কিছু সহজ রীতিনীতি।

আমি আজ পর্যন্ত তরুণদের অনেক ভাবে শেখাবার চেষ্টা করেছি যে কবিতা লেখা কঠিন না, যদি তোমার মধ্যে আগ্রহ থাকে। আমি একটু ছোট করে কবিতা সম্পর্কে বলছি। কবিতা এমন এক মাধ্যম যে মাধ্যম শুধুই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ কর না্‌ আমাদের নিজের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে শেখায়। আপনারা হয়তো ভাবছেন বিশ্বাসের সাথে কবিতার কী সম্পর্ক? আজ্ঞে হ্যাঁ, অনেক বড় সম্পর্ক আছে।

আমরা জানি যে বিষয়ে সন্দেহ আছে আমরা তাই বিশ্বাস করি। কবিতাও কিন্তু ঠিক একই ভাবে কাজ করে। ধরুন আজ আপনি কর্ণফুলী নদীর তীরে গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে দুই টাকার বাদাম কিনলেন এরপর ধীরে ধীরে চিবিয়ে খেলেন সেগুলো এবং তাকিয়ে থাকলেন সেই অতল গভীর নদীর দিকে। আর ঠিক সে সময় আপনি আকাশের পান্নে তাকিয়ে দেখেন কটি গাঙচিল উড়ে যাচ্ছে, নির্মল বাতাস বইছে। ঠিক ওই মুহূর্তে আপনার বিশ্বাস হয়ে যাবে পৃথিবী সুন্দর।

এখন যদি আপনি এইটুকু বিশ্বাস করেন যে আপনি কবিতা লিখতে পারবেন তবে অবশ্যই আপনি পারবেন। আপনার ইচ্ছে, বিচক্ষণতা , স্থিরতা, নিজস্বতা এ সবকিছুই আসবে যদি আপনি চান। আর কবিতা এ সকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আছে। নিজের মাঝে এসকল গুণাগুণ কীভাবে আনবেন তা অন্য কোনো ব্লগে অবশ্যই জানবো। চলুন এবার সহজ কিছু পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক। 

কিছু সসহজ পদ্ধতি:

১। প্রথমে শান্ত হয়ে বসুন ( ভোর অথবা গভীর রাতে )

২। নিজেকে স্থির করুন যে আজ আপনি কবিতা লিখবেন।

৩। আপনার ভিতরে যে লেখাই আসে লিখুন। একদম যেকোনো কিছু। সেটা এক লাইন বা দুই লাইনেরই হোক।

৪। লিখেহেন? এবার পড়ুন যেন আপনি শুনতে পান। কেমন যেন পানসে শোনাচ্ছে তাই তো? সমস্যা নেই।

৫। যেসকল জায়গায় মনে হচ্ছে সুর মিলছে না, অন্তমিল মিলছে না, শব্দ বেখাপ্পা মনে হচ্ছে, সে জায়গা গুলোতে দাগ দিয়ে রাখুন।

৬। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন দাগ দেয়া জায়গাগুলো কীভাবে ঠিক করা যায়। সেগুলো নিজের মন মত করে ঠিক করুন। আবার পড়ুন। ঠিক একই কাজ আগামী তিনদিন করে যান।

৭। চতুর্থ দিন আপনার লেখা গত তিনদিনের চেয়ে ভালো হয়ে যাবে। আমি বলবো না চারদিন এসব করেই আপনি  কবিতা লিখা শিখে যাবেন। এ কাজ গুলো করার একটিই কারণ, তা হলো এ চারদিনে আপনার বিশ্বাস হয়ে যাবে আপনি পারবেন। এন্ড দ্যাস্টস দ্যা পয়েন্ট অফ অল দ্যোস থিঙস।

৮। এখন আপনার আসল কাজ শুরু। এখন ভাবুন আপনার কোন বিষয় ভালো লাগে। যেকোনো বিষয় হোক তা। বেছে নিয়েচ্ছেন তাই তো ? তাহলে সেই একই  কাজ করুন ( ১ থেকে ৬ পর্যন্ত )।

৯। যা বলেছি করছেন তো? তাহলে একই কাজের সাথে নতুন করে যোগ করুন সেই বাছাই করা বিষয় সম্পর্কিত বই, আর্টিকেল, ব্লগ অথবা অন্য কোনো কবির বিষয়টি নিয়ে লেখা কবিতা। 

১০। প্রিয় বিষয়টির পাশাপাশি চেষ্টা করুন অন্য আরো দুটি বিষয়ের উপর পড়া এবং আগের দেয়া কাজগুলো করতে থাকুন।

১১। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, প্রথম তিন মাসে কোনো ক্রমেই পুস্তকীর নিয়ম মানবেন না। অর্থাৎ কোনো পর্ব, মাত্রা, বানান সহ রীতিনীতির দিকে মন দেওয়ার দরকার নেই।

১২। আপনার সবটুকু ধ্যান থাকবে এক মাত্র লেখা কি অর্থবোধক হচ্ছে কিনা! অন্তমিল আছে কিনা।

১৩। ব্যাস, এইটুকু করে যান প্রতিদিন। কাজগুলো ধারাবাহিক রাখার চেষ্টা করুন। আস্থা রাখুন আপনি পারবেন। 


শেষ কথা

যাক অনেকক্ষণ অনেক কথা হলো। জানি না কতটুকু বুঝাতে পেরেছি, জানাতে পেরেছি। অনেক কিছু জানাতে চেয়েও পারেনি কিছু বাঁধার আশংঙ্খায়। তবে একটি কথা আমি অবশ্যই বলবো এবং তা হলো এ কয়টি নিয়ম মেনে চললেই আপনি কবি হতে পারবেন না। কবি একটি ছোট শব্দ হতে পারে ঠিকি কিন্তু এর গভীরতা সাগরতুল্য। আপনি ততক্ষণ কবি না যতক্ষণ আপনি কবিতার জন্যে ত্যাগ স্বীকার করছেন না। কবিতাকে ভালোবাসার আগে যদি নিজেকেই ভালোবাসতে না পারেন তবে আপনি নিজেকে কবি দাবী করতে পারেন না।

এ কথা বলতে পারেন, আমি তো এতদিন মানুষ চিনলাম, নিজেরে চিনলাম কই? কথাটি অবশ্য আমার নিজীর তবুও এ কথাটি কবি হওয়ার সাথে জড়িত। এক জীবনও যথেষ্ট নয় নিজেকে চেনার জন্য তবুও চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? কিছু মানুষ খুব কম সময়ে নিজেকে চিনে ফেলে, নিজের সম্পর্কে সব কিছু জেনে যায় আবার একইদিকে কিছু মানুষের অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায় শুধু আমি কে, আমি কে ? বলতে বলতে।

তাআই নিজেকে চেনার প্রয়াআস করুন। এরপর কবিতার দিকে হাত বাড়ান, কবিতা আপনার কাছে ধরা দেবেই। জ্বী, আজ এতটুকুই, হয়তো অন্য কোনো একদিন অন্য কোনো ব্লগে দেখা হবে, কথা হবে।

ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

ধন্যবাদ। 

লেখায় - মুনতাসির নাহিয়ান

#Sorces

কবিতা - উইকিপিডিয়া (wikipedia.org)

গিলগামেশ মহাকাব্য: পৃথিবীর প্রাচীনতম উপাখ্যান (roar.media)

Comments